
বঙ্গ-নিউজঃ উপমহাদেশের অন্যতম প্রচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন হবে আগামী ২০ ডিসেম্বর শুক্রবার বেলা ৩টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে কাউন্সিলের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পদ্মা সেতুর আদলে তৈরি করা হয়েছে সম্মেলন মঞ্চ। দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ২১ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে কাউন্সিল অধিবেশনে তিন বছরের জন্য দলের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির সভানেত্রী পদে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাই থাকছেন। তাকে ছাড়া কাউকে মেনে নিতে চান না দলের কাউন্সিলরসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। তবে অন্য আর কারো পদই নিশ্চিত নয়। দল-মতনির্বিশেষে সবার জানার আগ্রহ—কে হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক? ওবায়দুল কাদেরই থাকছেন, নাকি নতুন কেউ? শনিবার কাউন্সিল অধিবেশনে তা জানা যাবে। এদিকে এবার সম্মেলনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। এক, নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ৩৩ শতাংশ নারী কোটা পূরণ করা; দুই, দলের সহসম্পাদক পদ উঠিয়ে দেওয়া।
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে আগামী বছর এই সময়সীমা শেষ হবে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল এখনো এই কোটা পূরণ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের আগামী ২১তম জাতীয় সম্মেলনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) শর্তানুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারীকে দলের বিভিন্ন পদে রাখতে চায় বলে জানিয়েছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। সর্বশেষ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত ৮১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী ছিলেন মাত্র ১৫ জন। অর্থাত্, ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী রয়েছেন। এখনো লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ পিছিয়ে আছে। দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ১৪ সদস্যের প্রেসিডিয়াম সদস্যের মধ্যে তিন জন নারী হলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী ও সাহারা খাতুন। ৩১টি সম্পাদকীয় পদের মধ্যে নারীরা পেয়েছেন মাত্র ছয়টি পদ। তারা হলেন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পদে শাম্মী আহমেদ, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, নারীবিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা, শিক্ষা ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা। ২৮ জন সদস্যের মধ্যে নারী আছেন পাঁচ জন। এবার নতুন ও পুরোনো নেত্রীদের সমন্বয়ে নারী কোটা পূরণ করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। দলের জন্য অসামান্য অবদান রাখা নেতাদের পরিবারের যোগ্য নারী সদস্যদেরও নেতৃত্বে আনা হতে পারে। এক্ষেত্রে জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যদেরও দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আলোচনায় রয়েছেন শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা ও প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোটো বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি, শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. এ এফ এম আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী শম্পা, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও সাবেক এমপি ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি, সাবেক এমপি সানজিদা খানম, বরিশালের প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণের স্ত্রী জেবুন্নেছা হিরণ, জামালপুরের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য মাহজাবিন খালেদ, শহিদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত আতাউর রহমান খান কায়সারের মেয়ে ওয়াসিকা আয়েশা খান এমপি, শহিদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার, ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের মেয়ে সুজাতা হক প্রমুখ। ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সবার আমলনামা যাচাই করা হয়েছে।
এদিকে এবার দলে সহসম্পাদক পদ থাকছে না। সম্মেলন সামনে রেখে দলটির গঠনতন্ত্র সংশোধন উপকমিটি ইতিমধ্যে এসংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় গণভবনে অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকে গঠনতন্ত্রে উপসম্পাদক পদ বাদ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হবে। পরে দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিলের দ্বিতীয় অধিবেশনে এটি উত্থাপন করা হবে। সেখানে কণ্ঠভোটে পাশ হলে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র থেকে সহসম্পাদক পদটি উঠে যাবে। অতীতের অধিকাংশ কাউন্সিলে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে আপত্তি করেননি কাউন্সিলররা। প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগের উপকমিটির সহসম্পাদক নিয়ে বর্তমান কমিটির শুরুতেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বিতর্কিত অনেকে পদ পেয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন। সহসম্পাদক কতজন, তার হিসাবও সঠিক ছিল না। গঠনতন্ত্রে ৯৫ জন থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা সহস্রাধিক ছিল বলে সে সময় অনেকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে অভিযোগ করেন। বিষয়টি দলের হাইকমান্ড পর্যন্ত গড়ালে সহসম্পাদক পদ স্থগিত করে উপকমিটি গঠন করা হয়। নবীনদের দলে সক্রিয় রাখতে এবং ‘পরিচয়’ দিতেই ২০১২ সালে সহসম্পাদক পদটি সৃষ্টি করা হয়। সে সময় ৭৩ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ৬৬ জনকে সহসম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
সম্মেলন সফল করতে গঠিত ১১টি উপকমিটির নেতারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। সারাদেশ থেকে ৭ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর, ১৫ হাজার ডেলিগেটসহ ৫০ হাজার নেতাকর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথি সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। ১৬ ডিসেম্বর থেকে চার দিন সাধারণ মানুষের জন্য মঞ্চ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
নেতৃত্বে আসতে পারে একঝাঁক নতুন মুখ
তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সবাই চান শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে হতে যাওয়া সম্মেলনে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন। অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের দুর্দিনে ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা বলছেন, ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে ভাবনা—এসব বিবেচনায় এবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একঝাঁক নতুন মুখ দেখা যেতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। তারা বলছেন, ত্রিবার্ষিক এই সম্মেলনে পরীক্ষিত তরুণদের অনেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলে আসতে পারেন। চমক হয়ে দেখা দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তনও। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনের দায়িত্ব কাউন্সিলরদের। কিন্তু কাউন্সিলররা বরাবরই এ দায়িত্ব ন্যস্ত করেন সভাপতির ওপর। তাই পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নির্ভর করবে আওয়ামী লীগের সভাপতির সিদ্ধান্তের ওপর। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর ‘এক নেতা এক পদ বা দল ও সরকার’ পৃথক করার ফর্মুলা বাস্তবায়ন হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আসতে পারে তুলনামূলক নতুন মুখ। আওয়ামী লীগের সব সম্মেলনেই নেতৃত্বের পরিবর্তন নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। সম্মেলন সামনে রেখে ইতিমধ্যে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির তরুণ নেতাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। ছাত্রলীগের সাবেক ত্যাগী নেতা, বিভিন্ন কারণে নিষ্ক্রিয় কিন্তু দলের প্রতি নিবেদিত, নির্বাচন ও দলের দুর্দিনে যারা সাহসী ভূমিকা রেখেছেন এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর সাবেক কয়েকজন নেতার ভাগ্য খুলতে পারে। অন্যদিকে যারা টেন্ডার ও চাঁদাবাজ এবং ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত, দলীয় কোন্দল সৃষ্টিকারী, বিএনপি-জামায়াত ঘরানার নেতাদের যারা দলে ভিড়িয়েছেন এবং বিভিন্ন নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে যারা কাজ করেছেন—এমন নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ সময়: ৯:২২:০২ ৬০৩ বার পঠিত # #আওয়ামী লীগ #ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী #জাতীয় সম্মেলন #মুক্তিযুদ্ধ #শেখ হাসিনা